Grumpy Fish

গাছের সাথে ‘ইকোশিয়া’-র সন্ধি

আমাদের কাছে এক সেকেন্ডের মূল্য কতখানি? একবাক্যে উত্তর আসবে- ‘মামুলি।’ কিন্তু এই এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে একটি গাছ লাগানো হয়ে গেছে বিশ্বের কোন এক প্রান্তে! 
পৃথিবীতে যতটা পাল্লা জংসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তারচেয়ে বেশি পাল্লা দিয়ে কমছে গাছপালা, উজাড় হচ্ছে বন। সচেতনতার অভাব কিংবা আমাদের অনীহায় পৃথিবী হারাচ্ছে সবুজ শোভা। ঠিক এমন সময় স্বস্তির সুবাতাস নিয়ে এগিয়ে এসেছে একদল লোক ও তাদের উদ্যোগ- ‘ইকোশিয়া’।

ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র জার্মান তরুণ ক্রিশ্চিয়াল ক্রোল পড়াশুনা শেষে বিশ্বভ্রমণের চিন্তায় মশগুল হয়। সেই ভ্রমণ নিছক আনন্দবিলাসের উদ্দেশ্যে নয়, ছিল ব্যবসায়িক ধ্যানধারণায় ভরপুর। অভিনব সব আইডিয়া সংগ্রহের অভিলাসেই তার ঘর ছাড়া। ঘুরতে ঘুরতেই উপলব্ধি করেছেন, পৃথিবী প্রযুক্তির দাসত্ব গ্রহণ করছে ভীষণ দ্রুততায়। এরচেয়েও দ্রুতগতিতে কমছে গাছপালা। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে কিভাবে এই সমস্যা দূর করা যায়, সেটি ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে অভিনব আইডিয়া। ২০০৯ এর ৭ ডিসেম্বর কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলনে পথচলা শুরু হয় নতুন এক সার্চ ইঞ্জিন ‘ইকোশিয়া’র।

ভোগে নয়, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ! লাভের ৮০ শতাংশ বনায়ন ও চ্যারিটির কাজে ব্যয় করে যেন প্রবাদ বাক্যের সার্থকতা প্রমাণ করে যাচ্ছে ইকোশিয়া। প্রচার কেবল বৃক্ষরোপণের জন্যই করছে, নিজেদের জন্য নয়। শুরুর দিকে কয়েকবছর বিভিন্ন সভা, সেমিনারে গাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলে গেছে টিম ইকোশিয়া। বিভিন্ন জায়গায় গাছ উপহার দিয়ে আসত। ধীরে ধীরে সবকিছু গুছিয়ে নিতে থাকেন ক্রোল। ইয়াহু, বিং এর মতোন প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। শুরু হয় চ্যালেঞ্জিং যাত্রা! আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য টিম শুম্যাচারকে সাথে নিয়ে নেমে পড়েন বনায়নে। বড় পরিসরে গাছ লাগানো হয় ব্রাজিলের জুরুয়েনা জাতীয় উদ্যান ও অ্যামাজনের একটা ছোট্ট অংশে। তারপর একে একে পেরু, কলম্বিয়া, স্পেন, হাইতি, উগান্ডা, বুরকিনা ফাসো, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া; ১৫টি দেশে ২০টি বৃক্ষরোপন প্রজেক্টের সফল বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে টিম ইকোশিয়া। আকাশ ফুঁড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়তে থাকে চারাগাছ। ইকোশিয়ার বর্তমান ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায়  ৮০ মিলিয়ন লোক, কয়েক বছর আগেও যা ছিল মাত্র ২০ মিলিয়ন।

ইকোশিয়া কিভাবে কাজ করে? কিভাবেই বা তারা করছে বনায়ন! এর ব্যবহারকারীরাই করছে কার্য সপম্পাদন। চাইলে আমি আপনিও হতে পারি ইকোশিয়ার এই মহা বৃক্ষরোপণ উৎসবের অংশ! গুগল প্লে-স্টোর থেকে নামিয়ে নিন  অ্যাপ্লিকেশনটি। এরপর লগইন করুন। প্রতিনিয়ত কত কী’ই না খোঁজ করি আমরা। ইকোশিয়ায় মাত্র ৪৫ বার কোন কিছু সার্চ করার পর আপনার নামে রোপন হয়ে যাবে একটি গাছ! সার্চপ্রতি ইকোশিয়ার আয় ০.৫ সেন্টস (ইউরোর হিসাবে)। প্রতিটি গাছ লাগাতে কর্তৃপক্ষের গড় খরচ ০.২২ ইউরো। সেই হিসেবে একটি চারা গাছের খরচ উঠে আসে ৪৫ বার সার্চ করার পর। এরপর বাড়তে থাকবে সংখ্যা।

প্রযুক্তির উৎকর্ষে আমরা আধুনিক হচ্ছি, মিলছে ভোগবিলাসের চূড়ান্ত সুবিধা। তবে সবকিছুই বৃথা, যদি মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিঃশ্বাস না নিতে পারি! ইচ্ছে থাকলেও সময়ের অভাবে গাছ লাগানো হয়ে ওঠে না আমাদের। ইকোশিয়া সেই সুযোগটাই করে দিচ্ছে যেন! আপনার কাজ আপনি করছেন, করতে করতেই করে ফেলছেন অপূর্ণ কাজটাও- বৃক্ষরোপণ! সবুজ পৃথিবীর সাক্ষী হতে হাতের মুঠোয় থাকা প্রযুক্তিকে নিয়ে ক্রিশ্চিয়ান ক্রোলের হাত ধরে যে বিপ্লবের শুরু হয়েছে বছর নয়েক আগে, তাতে আজ গাছের সংখ্যা প্রায় ৯০ মিলিয়ন, অ্যান্ড স্টিল কাউন্টিং! প্রতি ০.৮ সেকেন্ডে একটি করে গাছ লাগাচ্ছে ইকোশিয়া কর্তৃপক্ষ! শুরুতে বলা এক সেকেন্ডের মাহাত্ম্য এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন!