Grumpy Fish

অসুর: সৃষ্টি কিংবা ধ্বংসের উন্মাতাল নেশা

প্রশ্ন ছুঁড়ি একটা, কেমন? প্রশ্নের উত্তর অবশ্য জেনে থাকার কথা।

প্রশ্নখানা হলো- ‘একজন শিল্পী সবকিছু অবহেলা করলেও কখনো কিসের সঙ্গে আপোস করেন না?’ জলের মতো সহজ উত্তর। শিল্পী নিজের কাজের সঙ্গে কখনো আপোস করেন না। একদম তাই! সেই শিল্পীরই প্রতিভার সবটুকু দিয়ে তৈরি করা সৃষ্টি যখন প্রস্ফুটিত হবার আগে থেমে যায় তখন তার স্রষ্টার কাছে অর্থহীন ঠেকে বাকী সব।

কিগান মান্ডি, চারুকলার এক বাউন্ডুলে শিক্ষক। যিনি ক্লাসে আসেন পাঞ্জাবির নিচে পায়জাম না পরে। যিনি পায়জামা পরেছেন কিনা তা জানতে চান রিকশাওয়ালার কাছে। প্রখর মেধাবি হলেও পাগলামি স্বভাবের দরুণ বরখাস্ত হন কলেজ থেকে। বরখাস্ত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন দেখিয়ে দেবেন দুনিয়াকে। দূর্গাপূজোকে পাখির চোখ করেন। বানাবেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দূর্গা ভাস্কর্য। দশমীর পর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। কিগান বিশ্বাস করে তার কাজ এতটাই মুগ্ধতা ছড়াবে, সেটি বিসর্জন দেবার কথা বেমালুম ভুলে যাবে সকলে।

কিন্তু সব তো নিজের আঁকা ছকে চলে না। এটাও চলল না। কর্পোরেট দুনিয়ার হেভিওয়েট বোধিসত্ত্ব বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় কিগানের পথে। হবে নাইবা কেন! ওর প্রতিষ্ঠান কলকাতা শহরে ছাপ্পান্নটা পূজোর স্পন্সর করে প্রতিবছর, অথচ এবার সবার মুখে মুখে শুধুই কিগান আর দেশবন্ধু পার্কের ব্যানারে তৈরি ভাস্কর্যের গুণকীর্তন। দেড় দশকের বন্ধুত্ব, তবু নিজেকে বারংবার পরিচয় দেয় কিগানের সবচাইতে বড় শত্রু হিসেবে! প্রিয়তমা স্ত্রী অদিতি ভালবাসে এই পাগল কিগানকে। অথচ শিক্ষা, সম্মান, সমাজে অবস্থান এমনকি চেহারায়ও কিগানের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে বোধি। এরপরেও ওর কাছে হেরে যাচ্ছে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে। 

২০১৫ সালের দূর্গাপূজার আগে কলকাতার আনাচে কানাচে, শপিংমল থেকে শুরু করে পার্ক কিংবা বাস ট্রাম, গলির মাথায় শোভা পাচ্ছিল এক লাইনের একটি বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড।”এতো বড়! সত্যি?” রাজ্যজুড়ে একটাই আলোচনা। দেশপ্রিয় পার্ক সেবার এভাবেই জানান দেয় গোটা রাজ্যকে, আমরা আসছি সবচেয়ে বড় দূর্গা প্রতিমা নিয়ে! এমন প্রতিমা কেউ আগে দেখেনি। হলোও তাই। কিন্তু বিধিবাম! তৃতীয়ার দিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়াট পর মানুষের ভীড় উপচে পড়তে থাকে। দূরদূরান্ত, দেশবিদেশ হতে দর্শনার্থী আসে। ভীড় সামলানো দায় হয়ে পড়ে কর্তৃপক্ষের। কলকাতার বাকী সব পূজো একদিকে, জনসমাগম আর দেশপ্রিয় পার্ক অন্যদিকে। পঞ্চমীর দিন পদপিষ্ট হয় মানুষ, হতাহত হয় অনেকে। বন্ধ করে দেওয়া হয় পূজো। ভেঙ্গে ফেলা হয় প্রতিমা। শুরুর আগেই রচিত হয় শেষের গল্প, যার পুরোটাজুড়ে বিষাদ! এই ঘটনাকেই সেলুলয়েডে তুলে আনেন পাভেল, প্রযোজনায় জিতের জিৎজ ফিল্মওয়ার্ক। 

কিগান চরিত্রে জিৎ, বোধিসত্ত্ব চরিত্রে আবীর, অদিতির ভূমিকায় নুসরাত; একে অপরের পরিপূরক। এদের একজনকে ছাড়াও পূর্ণতা পেত না সিনেমা। গল্প যতটা ভাঙ্গাগড়ার, ততটাই প্রেমের। ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। পরিচালক পাভেল এই সিনেমার প্রতিটি ঘটনাকে, চরিত্রকে খুব সুন্দর করে বর্ণনা দিয়েছেন। সত্যিকারের অসুর কে? চোখের সামনে গল্প এগিয়ে যাবে আর আপনি ভাববেন ধরে ফেলেছেন কে অসুর! আসলে কিছুই ধরতে পারেননি।

এন্টি হিরো হিসেবে আবীর পারফেক্ট, আবার বাবা হিসেবে অনবদ্য। তার সন্তানের ভূমিকায় অভিনয় করা ছোট ছেলেটাও কী সাবলীল। নুসরাত এই ছবির প্রাণ। এতটা ন্যাচারাল অভিনয় সে আগে কখনো করেনি। আর যাকে ঘিরে সিনেমা সেই কিগান মান্ডি কিংবা জিৎ যা’ই বলি, ক্যারিয়ারের সেরা কাজ করে ফেলেছে সে। কিগানকে ছাড়িয়ে যেতে জিতের অনেকদিন সময় লাগবে। যেমন লুক, তেমন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। প্রতিটা সংলাপ ছাড়ার সময় তার এক্সপ্রেশনে মনে হচ্ছিল যেন সত্যিই বাউন্ডুলে কোন শিল্পী কথা বলছে। কী সৃষ্টির উল্লাসে ছেলেমানুষি, কী অকস্মাৎ সামনে আসা সত্যে বিস্ময়ে হতবাক, কী বিনাশে বিজয়ের নিরবতায়, সর্বত্র সাবলীল! 

একটা সিনেমাকে পরিপূর্ণতা দিতে বিজিএম আর গানের জুড়ি নেই। অসুরকে কেবল মনে রাখা যাবে এর অসামান্য গানের জন্যে। ইমন, সায়নী, শোভন, উজ্জয়ণী, ইরফানদের কন্ঠে তোর হয়ে যেতে চাই, রাধা, মন জানে না ট্র্যাকগুলি কানে আরাম দেয়। সিনেমার কোন দূর্বল দিক নেই? আছে আছে! সবচেয়ে বড় যে দূর্গা, আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যেই ভাস্কর্য সেটি ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ অসুর টিম। দেশপ্রিয় পার্কের আটাশি ফুটের ওই ভাস্কর্য যতটা মনকাঁড়া, পর্দায় অত নয়। তবে সিনেমার বাকী সব দিক এহেন অপূর্ণতাকে ঢেকে দিতে পেরেছে জোরালোভাবে। হালকা চালের বিজিএম, চোখধাঁধানো কালার গ্রেডিং, সাউন্ড ইফেক্ট, অভিনয়, দৃশ্যায়ন আর গল্পের অনন্য সাধারণ উপস্থাপনায় অসুর অনায়াসে জায়গা করে নেবে টালিগঞ্জের অলটাইম ক্লাসিকের তালিকায়।