Grumpy Fish

ডেভিড ফিঞ্চার: দি মাস্টার অফ ডিসেপশন

আচ্ছা,আপনি কি এড্রেনালিন জাংকি?

অবাক হতে পারেন, ডেভিড ফিঞ্চার নামের লোকটার কথা বলতে গিয়ে এটা কি বলছি।

আছে ,কারন আছে।

তার আগে জানা যাক ,আপনি এড্রেনালিন জাংকি কিনা।

এড্রেনালিন জাংকি হলো,যে রোমাঞ্চকর ,উত্তেজনাপূর্ন  অভিজ্ঞতার প্রতি আসক্ত। রক্তে এড্রেনালিন নামের হরমোন এর বৃদ্ধি এর জন্য যারা অপেক্ষায় থাকে।

এখন চেনা চেনা লাগছে কি???

হ্যাঁ,আপনি যদি এমন একজন হন, তবে রোমাঞ্চের খোঁজ আপনার প্রতিনিয়ত।কিন্তু ঘরে বসে কিভাবে পাবেন সেটা?

এখন মুশফিকুর রহিমের মত করে বলি, ‘আরেহ চাচা, ডেভিড ফিঞ্চার আছে না?’

সিনেমাপ্রেমিক দের জন্য এক পশলা রোমাঞ্চ মেশানো বৃষ্টির নাম,ডেভিড ফিঞ্চার।

তো ,কে এই ডেভিড ফিঞ্চার?

উনার পুরো নাম, ডেভিড এন্ড্রু লিও ফিঞ্চার।

১৯৬২ সালে আমেরিকার কলোরাডো তে জন্ম নেয়া এই পরিচালকের কিন্তু হলিঊডে আগমন বিজ্ঞাপন এবং মিউজিক ভিডিও পরিচালনার মাধ্যমে।

জর্জ লুকাসের (স্টার ওয়ার্স মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজির স্রষ্টা) প্রতিবেশী হিসেবে শৈশব কাটানো ফিঞ্চার পরে ওরিগন এ স্থানান্তর করে এশল্যান্ড হাই স্কুলে ভর্তি হন।

সেখানে তিনি বিভিন্ন নাটক এ দিক-নির্দেশনা দেন,সেট ডিজাইনের কাজ করেন। কিন্তু ক্যামেরার সাথে সখ্যতা কিন্তু অনেক আগের।

সাত বছর বয়সী ফিঞ্চার এর মনোজগতে আলোড়ন তোলে পল নিউম্যান এর ‘বুচ ক্যাসিডি এন্ড দ্য সানড্যান্স কিড’। আসক্ত হয়ে পড়েন ক্যামেরার প্রতি, আট বছর বয়স থেকেই ৮মিমি ক্যামেরা দিয়েই সেলুলয়েডের জগতে পদার্পণ এই সিনেমা-জাদুকরের।

তার মুভি ক্যারিয়ারের অভিষেক হয় ১৯৯২ সালে ‘এলিয়েন-৩ ’দিয়ে।

এই মুভি টি যদিও বেস্ট ভিজুয়াল ইফেক্ট ক্যাটাগরিতে অস্কারে নমিনেশন পায়, তবু ফিঞ্চার তার পরিচালিত প্রথম মুভিকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন বলে স্বীকার করেছেন।

এখন পর্যন্ত মুক্তি পাওয়া তার পরিচালিত মুভির সংখ্যা ১০।

১। এলিয়েন -৩ ( পজিশন ১০)

২। সেভেন(পজিশন ২)

৩। দি গেম(পজিশন ৭)

৪। ফাইট ক্লাব(পজিশন ১)

৫। প্যানিক রুম(পজিশন ৯)

৬। জোডিয়াক(পজিশন ৫)

৭। দি কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন(পজিশন ৩)

৮। দি সোশ্যাল নেটওয়ার্ক(পজিশন ৪)

৯। দি গার্ল উইথ দি ড্রাগন ট্যাটু(পজিশন ৮)

১০। গন গার্ল(পজিশন ৬)

এই লিস্ট টা করা মুভি প্রকাশের সাল অনুযায়ী। যেমন, ১ নং মুভিটি ১৯৯২ সালে , ২ নং মুভিটি ১৯৯৫ সালে।

ডান পাশের পজিশন লেখা সংখ্যা টা আমার দৃষ্টিতে সেরা মুভির। যেমন আমার কাছে সবথেকে সেরা , ফাইট ক্লাব ,তাই পজিশন ১।

 এই লিস্ট থেকে আমার ফেভারিট  ৩ টি মুভি নিয়ে কথা বলি।

‘সেভেন’ মুভিটিতেই প্রথম পাওয়া যায় ফিঞ্চার ধরনের রোমাঞ্চের স্বাদ । ব্র্যাড পিট ,মরগান ফ্রিম্যান, কেভিন স্পেসি অভিনীত নিও-নয়্যার ক্রাইম থ্রিলার ঘরানার এই মুভিতে তিনি বুঝিয়ে দেন হলিউডে শুধুমাত্র থিতু হতেই তিনি আসনেনি, এসেছেন নাম উচ্চারন হবার সাথে সাথে চোখে একরাশ মুগ্ধতার আগমন ঘটাতে।

মুভিটি দেখতে দেখতে ফিঞ্চার এর অসাধারন পরিচালনার সাথে সাথে অসাধারন গল্প আর অভিনয় আপনাকে সিটের কিনারায় রাখতে বাধ্য করবে। যদি এই মুভিটা না দেখে থাকেন,তবে দেখে ফেলুন আর অপেক্ষা করুন এক ধাক্কার।

ডেভিড ফিঞ্চার এর পরিচালিত চতুর্থ এবং উনার পরিচালিত মুভির মাঝে আমার ফেভারিট ‘ ফাইট ক্লাব’।

 তো ব্র্যাড পিট, এডওয়ার্ড নরটন অভিনীত ‘ফাইট ক্লাব’ হলো…

… ইয়ে, ফাইট ক্লাব নিয়ে কিছু বলা যাবে না। টাইলার ডারডেন এর নিষেধ আছে।

কিন্তু এটুকু বলি, প্রায় আড়াই ঘন্টা এ মুভির প্রতিটি ডায়লগ আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনতে বাধ্য হবেন। টাইলার ডারডেন এর জগতে ঢুকে যাবেন সম্মোহিতের মত এবং তার পরেই আপনার সেই জগত টা ওলট পালট হয়ে যাবে ।

যদি না দেখে থাকেন ডেভিড ফিঞ্চার এর অসামান্য সৃষ্টি, তবে বলে রাখি, এই মুভিটির  ডায়লগ গুলো আপনাকে ভাবাবে।

নাহ, ভাবাতে বাধ্য করবে। হারিয়ে যাবেন ,কিন্তু টাইলারের জগতে বারবার হারাতে ভাল লাগবে।

বার বার।

‘দি কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন ’ ডেভিড ফিঞ্চার পরিচালিত সপ্তম মুভি এবং কেট ব্ল্যানচেট ,ব্র্যাড পিট অভিনীত এই মুভিটি গল্প বলে বেঞ্জামিন বাটনের।

নাহ, এই মুভিতে আগের উল্লেখিত দুটি মুভির মত উত্তেজনা নেই।  বেঞ্জামিন বাটন এর জীবন শুরু হয় বুড়ো হয়ে। বুড়ো শরীরে আটকে পড়ে একটা শিশু। আস্তে আস্তে আটকে পরা শিশু টি বড় হতে থাকে, আর তার খাঁচার বয়স কমতে থাকে।

এই অদ্ভুত সমন্বয় এর জীবনে কিসের কিসের সম্মুক্ষীণ হতে হয় বেঞ্জামিনের, সেটা নিয়েই ছবির গল্প এগোয়।

মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে নিজেকে বেঞ্জামিন ভাবতে ভাবতে এগোতে থাকবেন ।

পরিচালকের দক্ষতার প্রকাশ প্রতিটি ফ্রেমে ফ্রেমে।

কোন জিনিসগুলো আলাদা করে তোলে ডেভিড ফিঞ্চার কে?

তার ছবি বানানোর ধরন।

তার কাছে সহজে কোন দৃশ্য ধারনের থেকে মুখ্য পারফেকশন। যে জন্য তার পরিচালিত মুভি গুলোতে সি জি আই (কম্পিউটার জেনারেটেড ইমেজারি) এর ব্যবহার প্রচুর।

প্রতিটি ফ্রেম, এমন কি আপাত দৃষ্টিতে গুরুত্বহীন একটি দৃশ্য ও তিনি ব্যবহার করবেন সি জি আই, শুধুমাত্র পারফেকশন এর জন্য।

আপনি মনে করছেন একটা দৃশ্য হয়তো সি জি আই ছাড়াই হয়েছে, কিন্তু না, ডেভিড ফিঞ্চার আপনাকে দ্বিতীয়বার ভাবাবে।

উপরের ছবি টি, জোডিয়াক মুভির একটি দৃশ্য,সি জি আই ব্যবহার করার আগে এবং পরে।

ডেভিড ফিঞ্চার এর আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো একটি দৃশ্যের জন্য অসংখ্যবার শ্যূট করে থাকেন। সে সংখ্যা মাঝে মাঝে ৫০ ও ছাড়িয়ে যায়।

জোডিয়াক মুভিতে অভিনয় করা জ্যাক জিলেনহাল ত এই বিষয়টি নিয়ে একই সাথে অস্বস্তিও প্রকাশ করেছেন আবার প্রশংসা ও করেছেন।

খুঁতখুঁতে এই পরিচালক খুব একটা হাতে ধারন কৃত ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণ করেন না, বেশিরভাগ সময়েই ট্রাইপড ব্যবহার করেন এবং দর্শকে বিভ্রান্তির মাঝে ফেলে দেন ক্যামেরার কাজের মাঝে।

তিনি বেস্ট ডিরেক্টর ক্যাটাগরিতে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন দুই বার, দি কিউরিয়াস কেস অফ বেঞ্জামিন বাটন এবং দি সোশ্যাল নেটোয়ার্ক এর জন্য।

গুণী এই পরিচালক কিন্তু  দুটি গ্র্যামি ও জিতেছেন,বেস্ট মিউজিক ভিডিও ডিরেকশন এর জন্য।

ও হ্যাঁ, অন্যতম সেরা পলিটিক্যাল ড্রামা সিরিজ , ‘হাউজ অফ কার্ডস’ এর দুটি এপিসোড ও পরিচালনা করেছেন তিনি। সেই সাথে তিনি এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার ও।

সেলুলয়েডের এই যাদুকরের যাদুতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়নি,এমন মানুষ কম আছে।

যদি আপনার লিস্ট এর মুভি গুলোর কোনটা দেখা বাকি থাকে, তবে সেই মুভিটা নিয়ে বসে পড়ুন না।

ঘন্টা দুয়েকের জন্য ডেভিড ফিঞ্চার এর  মায়াজালে হারিয়ে যান। কথা দিতে পারি, মায়াজালে বার বার জড়াতে ইচ্ছে করবে। মাস্টার অফ ডিসেপশন এর জাদুজালে স্বাগতম!