Grumpy Fish

মহীনের ঘোড়াগুলি

‘মহীনের ঘোড়াগুলি’- নামটা শুনে সেকেন্ডের ফ্র্যাকশনে চোখের দৃষ্টি খুঁজে বেড়ায় শব্দের উৎসকে, মুহূর্তেই কানে বেজে ওঠে গিটার-ট্যাম্বুরিন-বাঁশি আর স্যাক্সো-ড্রামের এক ঘোর লাগানো সংগীত! এ সেই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’, কলকাতার প্রথম বাংলা স্বাধীন রক ব্যান্ড, যাদের ‘আরবান ফোক-রক’ গান সময়-স্থান পেরিয়ে বর্তমান মিলেনিয়ামের এক আশ্চর্য নিদর্শন হয়ে আছে সকল শ্রেণীর রক সংগীত ভক্তদের কাছে।

বাংলা গানেও যে ‘রক’ হতে পারে, এবং একই সাথে শব্দ-সুরের এক্সপেরিমেন্ট; সুররিয়াল অ্যাবসার্ড এই জাদুর পথিকৃৎ সাতজন ক্ষ্যাপাটে ‘সপ্তর্ষী’ তরুণ নিয়ে গড়া এই ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। তারা ছিলেন তাদের সময়ের চাইতে অগ্রবর্তী, তাই সমসাময়িকরা সে গানের মর্ম বোঝেনি, কিংবা বুঝতেও চায়নি। রেকর্ডগুলো পড়েছিল বাতিলের খাতায়, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’কে চিনতে পারেনি কেউই।

কিন্তু এই ঘোড়ারা হারিয়ে যায়নি। কোন এক কার্তিকে বছর কুড়ি পর তারা ফিরেছিল। গানে-সুরে লুকিয়ে থাকা জীবন, প্রেম আর বিপ্লবকে হৃদয়ে ধারণ করতে এবার কারও দেরি হয়নি। সবার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের ‘সাইরেন অফ লাইফ’। কিংবদন্তী এই ব্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে ফিরে দেখা তিন পর্বের এই সিরিজে। ইউটিউবের চাদরে মোড়া মহীনের ক্যাসেট আর লং প্লে’ রিওয়াইন্ড করে ফিরে যাওয়া যাক কিঞ্চিত সুখী পাখিদের সংবেগে ঠাসা ইতিহাসের পাতায়, যেখানে হয়েছিল সবকিছুর শুরুটা।

ব্যান্ডটা তখনও কাগজে-কলমে গড়ে ওঠেনি, গৌতম চট্টোপাধ্যায় ওরফে মণিদার ভাঙ্গা পায়ের প্লাস্টারে প্রতীকী হয়ে ছিল মহীনের আগমনী বার্তা। মহীনের বাকি অশ্বদের জন্য গৌতমের পায়ের প্লাস্টারটা ছিল হাজিরার ট্যালি, আবার একই সাথে তাদের এলোমেলো গানের খাতা। মহীনের পথচলার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এই গৌতম ওরফে মণিদা’র প্রভাব, যাকে ধরা হত এই ব্যান্ডের ‘প্রাণ’! তাই শুরুতে তার গল্পটাও একটু বেশি।

গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের ছোট ভাই প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় ওরফে বুলাদা, আর তাদের পিসতুতো ভাই রঞ্জন ঘোষাল- সাথে যোগ হলো তপেশ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে ভানু, তাপস দাস ওরফে বাপি, এব্রাহাম মজুমদার আর বিশ্বনাথ চট্ট্যোপাধ্যায় ওরফে বিশু। এই নিয়ে মহীনের সাত ঘোড়া। কলকাতা শহরতলীর মধ্যরাতের নিশুতি ভেঙ্গে ড্রামস-গিটারে তাদের দাপাদাপি শুরু হয়েছিল নাকতলার বেকার হাউজে। এক দিন নয়, দিনের পর দিন। ফলে ঘোড়াদের উৎপাতে কিঞ্চিৎ ‘বিরক্ত’ হয়েই এক প্রতিবেশী সেই বাড়ির পাঁচিলে আলকাতরা দিয়ে লিখে রেখে গিয়েছিলেন ‘আস্তাবল’। যে আস্তাবলের সন্ধান বছর পঁচিশেক আগেই পেয়েছিলেন কবি জীবনানন্দ দাস।

ব্যান্ডের ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ নামটি কবিরই ‘ঘোড়া’ নামের একটি কবিতা থেকে তুলে আনা। ১৯৪৮ এর কোন এক সময়, যখন কবি কোন এক নির্জন রাতে কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে উচ্চারণ করেছিলেন,

‘আমরা যাইনি ম’রে আজো- তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় 

মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্না’র প্রান্তরে’

ঘোড়াগুলো নিঝঝুম কলকাতার অলি-গলি আর নিওলিথ মহেঞ্জোদারোর প্রান্তর ঘুরে কার্তিক মাসে এসে ধরা দিয়েছিল কবি জীবনানন্দের ঘোর লাগানো চোখে। অবশ্য জীবনানন্দ জানেননি, তার ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ আস্তাবল ছেড়ে এখন ইতিহাস হয়েছে।

‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র গল্প করলে প্রথমে ফিরে যেতে হবে ষাটের দশকের শুরুতে- গৌতম আর প্রদীপের ঘরে। গৌতমরা ছিলেন পাঁচ ভাই। রক্তেই যেন গান মিশে ছিল গৌতমের, আর তার একদম বাধ্য অনুজ ছিলেন প্রদীপ ওরফে বুলাদা। তাদের বাবা ছিলেন বৈজ্ঞানিক, কিন্তু দারুণ সংগীতপ্রেমী। ঘরে তোলা ছিল সেতার, অর্গান, এস্রাজ, হারমোনিয়াম, ব্যাঞ্জো, ভায়োলিন, তবলার সমাহার, আর এদিকে গৌতম পারদর্শী একদম সবকিছুতেই! প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় নিজেই বলেছেন-

‘মণিদা সবই বাজাতে পারত। যে কোনও ইনস্ট্রুমেন্টই খুব সহজে বাজিয়ে ফেলত। তালিম ছাড়াই। নিজে নিজেই শিখে ফেলত বাজানোর আদবকায়দা।’

তবে গৌতম শুরুতে হাত পাকিয়েছিলেন তবলায়, বেনারসী ঘরানায়। মায়ের কাছে অন্যদিকে এস্রাজ শেখায় ব্যস্ত প্রদীপ। তবলার মৃদু বোল কিংবা দ্রুত লয়ের ঠেকে বেশ নাম-ডাকও কুড়িয়েছিলেন গৌতম। কিন্তু বেশিদিন ‘তবলচি’ হয়ে থাকতে চাননি স্বভাববিদ্রোহী গৌতম। তার অকাট্য অভিযোগ- যন্ত্রীদের যথার্থ সম্মানটা দেওয়া হয়না। গায়ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক সমান গুরুত্ব রাখেন যন্ত্রীরাও। ‘সঙ্গত’ শব্দটিতে ঘোর আপত্তি তার- এ যেন তাদেরকে ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন’ এর আওতায় ফেলে দেওয়া!

কিছুদিন বাদে প্রেসিডেন্সি কলেজে ফিজিওলজি নিয়ে পড়েছেন গৌতম, সাথে ভাই আর বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন রাস্তায় রাস্তায়। শুনছেন বেদেদের গান, আয়ত্ত্ব করছেন ট্রেনে সম্মিলিত তালে বেজে ওঠা ‘আরবান সিম্ফোনি’। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর গান আর কথা পরে ঠিকই স্থান পেয়েছে ব্যান্ডটির গানের খাতায়। কিন্তু রাজনীতির আকাশে যে কালো মেঘ থমকিয়ে ছিল, তা কিছুদিন পর টের পেয়েছিলেন তারা।

সময়টা ঠিক ষাটের শেষ, সত্তরের গোড়ায়। গৌতমের সাথে দেখা হয়েছিল অন্য দুই অশ্ব বিশু আর এব্রাহামের। বিটলস ভক্ত এই দুই টিন এজ কিছুদিনের মধ্যেই ভক্ত বনে যায় ‘মণিদা’র। এব্রাহামের হাতেখড়ি বেহালায়, আর বিশুর গিটারে। এদিকে তবলা ছেড়ে গৌতমের কাঁধে উঠেছে তখন গিটার। বিটলস, ডিলান, বিটোভেন, বায়েজ আর অন্যান্য পশ্চিমা সংগীতে মজেছেন, গড়ে তুলেছেন ‘আর্জ’ নামের একটি ব্যান্ড। ঝাঁকড়া বড় চুল আর ‘বিলিতি’ রকস্টার সাজে গৌতম ইংরেজি গান করলেও রাজনীতির প্রতি সূক্ষ্ম একটা টান অনুভব করছিলেন তখন থেকেই।

৬৮’তে নিক্সন বসলেন ক্ষমতায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে। ভিয়েতনামে শুরু হল মার্কিন সৈন্যদের গণহত্যা। এদিকে কলকাতাজুড়ে তখন নকশাল আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বারুদ আকারে। চারু মজুমদারের বিপ্লবের ডাকে সাড়া দিয়েছিল কলকাতার কলেজপড়ুয়া অসংখ্য ছেলেমেয়ে।  হাতে ‘লালবই,’ আর চোখে আগুনরাঙ্গা বিপ্লবের স্বপ্ন- এক মোহময় রোমান্টিসিজম ফয়েলে মোড়ানো ছাত্ররা সেসময় কৃষকদের সাথে সম্মিলিত হয়েছিল ধনিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে। ট্রিংকার্স ক্লাব কিংবা মুলাঁরুশের আলো ঝলমলে সন্ধ্যা আর খ্যাতি ছুঁড়ে ফেলে ‘আর্জ’ ছেড়ে দিয়েছিলেন গৌতম, উপলব্ধি করেছিলেন ইংরেজি গান করে আসলে কোন কিছু বদলানো সম্ভব না। এই বারুদ সময়ে সামিল হলেন নকশাল রাজনীতিতে, বিই কলেজ পড়ুয়া প্রদীপও যোগ হলেন সাথে।

চলমান আন্দোলনের সময়টা নিঃসন্দেহে দাগ কেটে গিয়েছিল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র সদস্যদের মাঝে। ৭০’ এ ঘরছাড়া গৌতম গান-বাজনা ভুলে চলে গেলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে, মিশলেন আপামর কৃষক সমাজে, শুনলেন তাদের গান। মাঠে প্রান্তরে নবান্নের গান তাকে অনুপ্রাণিত করলো, আর এগুলোই পরে আফ্রো-আমেরিকান ব্লুজ হিসেবে জীবন পেয়েছে মহীনের গানে। এদিকে কংগ্রেস-পুলিশ মিলে পুরো কলকাতাজুড়ে চালাচ্ছে নকশালবাদীদের দমন। গৌতম একবার বাড়ি ফিরে গ্রেফতার হলেন পুলিশের হাতে। ‘এনকাউন্টারে’ ঠিক তার চোখের সামনেই পড়লো প্রিয় বন্ধুর রক্তাক্ত লাশ। সে এক ভীতিকর সময়।

দেড় বছর জেলে কাটিয়েছিলেন গৌতম, এদিকে প্রদীপ তখনও আন্দোলনে ব্যতিব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আশ্চর্যের বিষয় ছিল, জেলে থাকাকালীন সময় অস্থিরতা নিয়ে কোন গান লেখেননি গৌতম, তার লেখা সেসময়ের বেশির ভাগ গানই ছিল রোম্যান্টিক। পশ্চিমবঙ্গে ফেরত না যাওয়ার শর্তে জেল থেকে ছাড়া পেলেন গৌতম। নকশাল আন্দোলন নিয়ে চলছে তুমুল গণ্ডগোল, একদিকে আদর্শদ্বন্দে ভোগা কমিউনিস্ট, অন্যদিকে পুলিশ, সি-আর-পি, কংগ্রেস আর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসীদের তাণ্ডবে স্তিমিত হয়ে আসতে থাকল আন্দোলন। রাজনীতি থেকে সরে এসে কাঁধে স্প্যানিশ গিটার ঝুলিয়ে মেডিকেল রিপ্রেসেন্টেটিভ হিসেবে ভোপাল পাড়ি জমালেন গৌতম। কলকাতায় পড়ে রইলেন প্রদীপ-রঞ্জন-ধূর্জটি। যদিও তাদের মাসতুতো ভাই ধূর্জটি মহীনের কোন গান শুনে যেতে পারেননি, প্রেম রহস্যের মায়াজালে আটকে আত্মহত্যা করেছিলেন ‘৭৪ সালে।

১৯৭৪ এলো। চাকরি-বাকরি ছেড়ে গৌতম ফিরে এলেন পুরোনো শহরতলী কলকাতামুখে। তখন গৌতম আর প্রদীপের বাসায় যাতায়াত ছিল এব্রাহাম, তপেশ, বিশু আর তাপসের। বাড়িতে কারোও কোন চাকরি নেই, তাই সবার প্রিয় ‘মণিদা’ বাড়ির নাম দিলেন ‘বেকার হাউজ’। সাতজোড়া চোখ তখন একই স্বপ্ন দেখছে- মিউজিক, রক মিউজিক! বাড়ির দেওয়ালে তিক্ততা মেশানো ‘আস্তাবল’ লেখাটাকে রীতিমত কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিলেন গৌতম, বাড়িতে সংগীত চর্চা বন্ধ হবার পরিবর্তে বাড়লো তার মাত্রা। আস্তাবলের ঘোড়াগুলোর প্রস্তুতি পর্ব চলছে তখন।

প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে নতুন গান, আর নতুন সুর।  ফ্রেজারগঞ্জে বন্ধুদের সাথে পিকনিকে খেলতে গিয়ে প্লাস্টারে ভাঙ্গা পা নিয়ে বিছানায় গৌতম পড়ে রইলেও ঠিকই তার প্লাস্টারের উপর ‘কলকাতা’ গানটি লিখে ফেলেন রঞ্জন। কিন্তু সবসময় ‘আস্তাবল’এ পড়ে রইলে তো আর রক মিউজিকটা করা হয়ে উঠবে না, তাই গৌতম সেরে উঠলে সাতজন মিলে শুরু করেন স্টেইজ শো।

বিপত্তিটা লাগলো নাম নিয়ে। সাতজন ভেবেই বোধহয় প্রথমে তারা শো করলেন ‘সপ্তর্ষী’ নামে। এসব ব্যাপারে অনেক বেখেয়ালী মানুষ গৌতম। এরকম এক শো’তে তাই নিজেদের পরিচয় করালেন ‘গৌতম চ্যাটার্জি বিএসসি অ্যান্ড সম্প্রদায়’ নামে। এসব নিয়ে ইয়ার্কি-ঠাট্টার অন্ত নেই। একদিন হঠাৎই সিরিয়াস হয়ে গেলেন রঞ্জন, জীবনানন্দের ‘সাতটি তারার তিমির’ বই থেকে বের করলেন ‘ঘোড়া’ কবিতাটি।

‘মণিদা, ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ রাখা যায়, কেমন হয়?’ রঞ্জন বললেন  

আর গৌতম ক্ষণিকেই হেসে বললেন, ‘এক্ষুনি ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।’

কুয়াশান্বিত জ্যোৎস্নায় তার বিলীয়মান দোলাচলে খুরশব্দহীন মহীনের ঘোড়াগুলি হ্রেষা ধ্বনি দিয়ে সেই থেকে এগিয়ে চলে পৃথিবীর প্রান্তরে।

আস্তাবল ছেড়ে কার্তিকের ভরা জ্যোৎস্নার কাশ বন পেরিয়ে ঘোড়াগুলির হ্রেষা ধ্বনি পৌঁছেছিল গোধুলির আলো রাঙ্গা দূর পাহাড়ের গায়ে। বেদনা বিধুর রাডারে শব্দের প্রতিধ্বনি চৈত্র হলুদ এক বিকেলে চূর্ণফুল হয়ে ঝরে পড়েছিল ঘোড়াগুলির নিস্তেজ কাফনে। স্বপ্নবিভোর সাত ঘোড়া শ্রান্ত বেশে শূন্যতার রানওয়েতে দাঁড়িয়ে। ‘সপ্তর্ষি’র সে আসর, ক্যাফের আড্ডা, নিঝুম রাতে ড্রামস, গিটার আর কন্ট্রাবেইসের দাপাদাপি- ঘোড়ারা ক্ষান্ত হল অবশেষে, বাস্তবতার কাছে হার মেনে। ১৯৮১ সাল। জমজমাট সে কলকাতা, শহর ট্রাম-লরি-বাস আর বলিউডের পোস্টারে ঠাসা। সত্যজিৎ রায় ভারতবর্ষ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক সিনেমা ব্যক্তিত্ব, সাথে ঋত্বিকেরও নাম-ডাক হয়েছে বেশ। চাকরির বাজারে মন্দা, ইন্টারভিউ’র লাইনে দাঁড়িয়ে কঙ্কালসার হয়ে ঘরে ফেরে একদল ঘর্মাক্ত যুবক। চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হয়ে তখন ক্ষমতায় ইন্দিরা গান্ধী। এমন এক সময়ে ঘোড়াদের প্রস্থান চোখে পড়েনি কারোরই, পড়ার কোন কারণও ছিল না।

ব্যান্ড হিসেবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ সে সময় তথাকথিত ‘শিল্পী’র তকমা পায়নি। তাদের বলা হত ‘ক্ষ্যাপাটে উন্মাদ’! আর উন্মাদের গান কেউ শোনে নাকি আবার?! মণিদারা প্রতিবেশির গালমন্দটাকে কমপ্লিমেন্ট হিসেবে নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু বাস্তবতার দৈনিক চপেটাঘাতে মিউজিকের নেশাটাকে দমাতে বাধ্য হয়েছিলেন তারা। যদিও দমিত ‘উন্মাদের গান’গুলো ঠিকই একদিন ফিনিক্স হয়ে ফিরেছিল ‘প্রজন্মের গান’ হয়ে- তবে সে পরের আলাপ।

যে সময়টায় মহীনের শুরু, পৃথিবীর ঠিক অপর পাশটায় ক্লাসিক রক অ্যান্ড রোলের বিবর্তন হচ্ছে ক্রমশঃ। ৭০ এর শুরুতে ছন্নছাড়া হল বিটলস, ঘোড়াদের জন্য যারা ছিল প্রকাণ্ড এক ইনফ্লুয়েন্স। ‘রাবার সোউল’ আর ‘সার্জেন্ট পেপার লোনলি হার্টস ক্লাব ব্যান্ড’ অ্যালবাম দু’টো ছিল চমকে ঠাসা! নেই কোন আপবিট টেম্পোর ছোঁয়া, টালমাটাল টাইম সিগনেচার আর গিটারের অ্যাবসার্ড কাজ। ফলে  বিটলসের ভক্তকূলের নিদারুণ প্রসার ঘটেছিল ক্রমেই, যারা ক্লাসিক রকের মাঝে খুঁজতেন ভিন্ন স্বাদ। আর পিঙ্ক ফ্লয়েডের ‘পাইপার অ্যাট দ্য গেইটস অফ ডন’ এ তারা খুঁজে পেলেন সাক্ষাৎ সঙ্গীতের এল ডোরাডো, রক প্রবেশ করল তার সবচেয়ে আনকনভেনশনাল জনরার জগতে- সাইকাডেলিয়া

সত্তরের পর সাইকাডেলিক রকের টর্চ বিয়ারার হয়ে উঠেছিল পিঙ্ক ফ্লয়েড। ‘সোর্সফুল অফ সিক্রেটস’ এর পর এলো ‘মেডলে’, ‘দ্য ওয়াল’ আর ‘ডার্ক সাইড অফ দ্য মুন’ এর মত ভয়ঙ্কর সব অ্যালবাম। থেমে নেই রোলিং স্টোনসও, তাদের গানেও চলছে আজব সব এক্সপেরিমেন্ট! রকের সাথে ধীরে ধীরে মিশলো স্যাক্সো, অরগান, কয়্যার মিউজিক- এমনকি সিতারের মত ইন্সট্রুমেন্ট! ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসার আগে ওয়েস্টার্ন মিউজিক মন ভরে আত্মস্থ করেছিলেন গৌতম, রঞ্জন, প্রদীপ, তাপস, তপেস, এব্রাহাম আর বিশু, বাদ ছিলনা শ্যোঁপা, বাখ, বিটোফেন কিংবা মোৎজার্ট। কলকাতার অলি-গলিতে চষে যে সিম্ফনিটা তারা রপ্ত করেছিলেন, নিজেদের গানে এসে সবকিছু একসাথে জোট বাঁধলো যেন- ওয়েস্টার্ন রক-সাইকাডেলিয়া আর কলকাতার আরবান সিম্ফোনির এক সুররিয়াল মিশেল। জ্যাজ, ফোক, সাইকাডেলিক, আরবান রক- সবকিছুকে এক ছাদের নিচে নিয়ে আসলে একে বলা যেতে পারে ভারতীয় আভা গার্দ।

মহীনদের রেকর্ডের প্রথম গান ‘হায় ভালোবাসি’ পরিচয় করায় ঘোড়াদের আর্টিস্ট্রির সাথে, তাদের দর্শন, ভালোবাসা আর হতাশার সাথে। জীবনানন্দের সাতটি তারার তিমিরের ঘোড়াগুলোর পোস্টমডার্নিটির সরাসরি এক্সপ্রেশন এই গান। স্প্যানিশ চিত্রকর পিকাসো আর ফিল্মমেকার বুনুয়েল বলুন কিংবা ইতালিয় কবি দান্তে আলিয়েগ্রি; কিংবা বিটলস, ডিলান আর বিটোফেনের নাম নেওয়ার সংগত কারণ কি? উত্তর- তারা যে যুগে অবস্থান করেছেন; তাদের শৈল্পিক আর্টিস্ট্রির এক্সপ্রেশন ছিল উৎপাদক (এখানে শিল্পী হিসেবে বোঝানো হয়েছে) আর ভোক্তার (শিল্পের দর্শক যারা) এর তথাকথিত সম্পর্কের তীব্র সমালোচনা। শিল্পী তাদের ভক্ত অনুরাগীর চাহিদার খাতিরে নিজেদের দর্শন এবং প্যাশনকে জলাঞ্জলি দিয়ে শিল্পকর্মের চর্চা করবেন- এমন মতাদর্শের ধার কখনোও ধারেন নি এই মানুষগুলো। আভা গার্দ মুভমেন্টের পরিধিটা ছিল বিশাল- সিনেমা, গান থেকে শুরু করে রাজনীতি, চিত্রকর্ম, কবিতা প্রায় সব আঙ্গিকেই এর চর্চা হচ্ছিল, বিশেষ করে ষাটের দশক এর শুরু থেকে। সমসাময়িক মেইনস্ট্রিমকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কখনই ছাড়তো না অল্টারনেটিভ আভা গার্দ মুভমেন্ট।

ভারতের প্রথম স্বাধীন রক ব্যান্ড- যাদের পূর্বে নেই কোন ইলেক্ট্রিক মিউজিকের মাতামাতি, এলিট পাড়াগুলোতে শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে হেমন্ত, লতা, মান্না, সলীলের সমাহার আর তল্লাটগুলো বলিউড-টালিউড সঙ্গীতের দৌরাত্ম্য- সেসময়ে যাত্রা পর্ব শুরু করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’। ৭৫’ এ পর্নশ্রী ক্লাবে প্রথম শো, তারপর থেকে ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’ ছুটলো তুমুল বেগে। রাত-দিনভর রিহার্সাল আর গিটার, অরগ্যান, ভায়োলিনে নতুন গানের সুতো বোনা। বিটোফেনের ট্রায়ো অফ ভায়োলিন শুনতে শুনতে একদিন গৌতম, এব্রাহাম আর প্রদীপের হাত ধরে জন্ম নিল ‘হায় ভালোবাসি’র অসামান্য স্ট্রিং অর্কেস্ট্রাল প্রিলিউড। সাথে ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’, ‘ভেসে আসে কলকাতা’ আর ‘সংবিঘ্ন পাখিকূল’ নিয়ে ৭৭’ বেরোল তাদের প্রথম অ্যালবাম সংবিঘ্ন পাখিকূল ও কলকাতা বিষয়ক

আবারও ফিরে তাকাই ‘হায় ভালোবাসি’র চিত্রপটে। গানটা চারপাশের পৃথিবী নিয়ে ব্যান্ডের সদস্যদের কল্পনা প্রসূত এক আনপ্যারালাল স্কেচবুক। আরবান ফোক রকে যেখানে মিশেছে অরগ্যান, ভায়োলিন আর ইলেক্ট্রিক গিটারের অর্কেস্ট্রাল এক সংমিশ্রন। ব্যান্ডের সদস্যরা তাদের মস্তিষ্কের খোরাক জুগিয়েছেন মাঠে প্রান্তরে ঘুরে, ক্ষেত-খামারের চাষা কিংবা গন্তব্যহীন বেদে-কাবুলিওয়ালাদের সাথে মিশে। লাইনগুলো এখানে গুরুত্বপূর্ণ-

‘যখন দেখি ওরা কাজ করে গ্রামে-বন্দরে

শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে-প্রান্তরে,

তখন, ভালো লাগে না, লাগে না কোন কিছুই

সুদিন; কাছে এসো, ভালোবাসি এ সব কিছুই’

‘হায় ভালোবাসি’ ঘোড়াদের শৌখিন ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি, একই সাথে কৃষক কিংবা শ্রমিকের মত সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠীর সাথে যে আত্মিক টান তাদের রয়েছে, লাইনগুলো সেটার অকাট্য স্বীকারোক্তি।

মহীনের গানজুড়ে রয়েছে কলকাতা নিয়ে ঘোড়াদের ফ্যাসিনেশন, অবসেশন আর ফ্রাস্ট্রেশান। কুয়াশা তুলিতে আঁকা কলকাতার ভেসে আসা সাইরেন শোনায় গৌতমের কর্কশ গিটারের আউট্রো- গৌতম যেন এক ক্ষ্যাপাটে জিম মরিসন ‘কলকাতা’ গানে। আকাশে থমকে থাকা মেঘের আড়ালে লুকানো পাখিদের বিষণ্নতার চিত্রপটের দেখা মেলে ‘সংবিঘ্ন পাখিকূল’এ। আগাছার জঞ্জালে মোড়া শূণ্যতা নিয়ে লেখা গান মনে করায় ঋত্বিকের সুবর্ণরেখার দৃশ্য- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত রানওয়েতে শৈশবের সীতা খেলতে যায় যেখানে।

গৌতমকে সবসময়েই ধরা হতো ঘোড়াদের সর্দার, কিন্তু স্টেইজে কিংবা অ্যালবামে তার প্রমাণ মিলতো সামান্যই। তিন অ্যালবামের আটটি গানের মধ্যে গেয়েছেন শুধুমাত্র একটি গানই, কিন্তু গানটিতে লুকিয়ে আছে ব্যান্ডের সুবিশাল পরিসর, যা কলকাতার আরবানিটি ছাড়িয়ে পৌঁছেছিল নির্জন এক সাঁওতাল পাড়ায়। উদাস এক ব্যক্তির ‘মেরুন সন্ধ্যালোক’ যাপন যেখানে ক্লাইম্যাক্টিক হয়ে ওঠে সাঁওতালি গানে, বিষণ্ন সুর পালটে হঠাৎই মনে দোলা দেওয়া এক শিমুলিয়া সুর-

জো জো দারু রে সিতা জুবা কা না সিতা জুবা কা না
সিতা হুঁ কাঁই কাঁই জুবা হুঁ জাঁই জাঁই
দুলাংগাতি জো জো জোমকে’

অর্থ জানা নেই। কিন্তু গান আর সুর রক্তে দোলা দেয়। এই গান মহীনের সুররিয়াল অ্যাবসার্ডিটির আইডেন্টিটি।

সাইকেডেলিক আর আরবান সিম্ফোনির এক্সপেরিমেন্টে ঠাঁসা এই অ্যালবাম বেরিয়েছিল গাঁথানি রেকর্ডস থেকে। তবে অ্যালবাম করার মত যথেষ্ট টাকা-কড়ির ঝনঝনি সে বেলা ছিল না বললেই চলে। শেষ রক্ষা ছিল তাদের এক শুভাকাঙ্খী বান্ধবী সঙ্গীতার থেকে টাকা ধারদেনা করে, যিনি কিনা পরবর্তীতে হয়েছিলেন রঞ্জন ঘোষালের সহধর্মিণী।

ঘোড়াদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটা ছিল স্টেইজে। কিন্তু শো মিলতো কদাচিৎ। তবে সেই আমলেও ঘোড়ার দল সাড়া ফেলে দিয়েছিল রবীন্দ্রসদনে মস্ত একটা শো করে। তিন পর্বের শোতে প্রথম ভাগে ছিল অ্যাকোস্টিক ইনস্ট্রুমেন্ট, সঙ্গে বাউল-সুফি-ভাটিয়ালির মেডলে। দ্বিতীয় ভাগে ছিল পুরনো বাংলা গান। অখিলবন্ধু ঘোষের গান থেকে শুরু করে শচীন দেববর্মণ- সকলের গানই গাওয়া হয়েছিল সেই পর্বে। আর তৃতীয় পর্বে ইলেকট্রিক রক। সঙ্গে কিছু বাউল এবং জ্যাজ়। দড়ি আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল স্টেজ ক্রাফট। ছোটবেলা থেকে জড়ো করা বেদের গান, বাউলসঙ্গ, মাঠের গান ঢুকে পড়েছিল আর্বান আধুনিক গান এবং তার পরিবেশনায়। প্রদীপ তার স্মৃতিকথায় বলেছিলেন-

‘স্টেইজ ক্রাফটেই মাতিয়ে দেওয়া গিয়েছিল দর্শককে। স্টেইজে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘বাঁশের ট্র্যাপিজ’।সেসব ঝুলতে ঝুলতে পারফর্ম করেছিলাম আমরা। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। হলফ করে বলতে পারি, কলকাতা এর আগে বা পরে অমন শো আর কখনো দেখে নি’

কিন্তু সবকিছুর ভিড়ে এক্সেপ্টেন্স নিয়ে একটা স্ট্রাগল চলছিল সবসময়। এমন বৈপ্লবিক বাংলা রক এক্সপেরিমেন্ট কলকাতার সে জেনারেশন হজম করতে পারেনি। কলকাতার ‘দূরদর্শন’এ ডাক পড়েছিল একবার ঘোড়াদের। ইন্সট্রুমেন্ট বিহীন সে স্টুডিওতে বিচিত্র খিস্তি খেউড় শুনতে হয়েছিল তাদের, অভিযোগ- ‘এগুলো কোন গান হলো নাকি!’ প্রথম অ্যালবাম বেরোনোর পর অবশ্য আনন্দবাজারে প্রশংসাসূচক কড়চা লিখেছিলেন কলামিস্ট শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়। সে সুবাদে পরবর্তীতে দূরদর্শনে পারফর্ম করেছিল মহীন।তবে সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ এসে জুটেছিল পঞ্চাশের দশকের আলোড়ন তোলা কবি দীপক মজুমদারের কাছ থেকে, যিনি ছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার সম্পাদক। তার লেখায় মহীনের গান শোনার এক উদাত্ত আহবান-

ঘোড়াগুলির স্বাস্থ্য ভালো, গলা খারাপ নয়, হাত তো চমৎকার মুষ্টিবদ্ধ।প্রসঙ্গতঃ এদের একটি রেকর্ড আছে, নামঃ সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক। পাঠক যথাশীঘ্রসম্ভব কিনুন, ঠকবেন না, একটা অভিজ্ঞতা হবে অন্যধরণের বাংলা গান শোনার।”

৭৮’ এ হিন্দুস্থান রেকর্ডস বের করলো ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব’। প্রথম অ্যালবামের চাইতে এই অ্যালবামে এক্সপেরিমেন্টেশন ছাড়িয়ে গেল মহাকাশকেও! মহীনের সুরে কলকাতার ভৌতিক কেরানীর মেসে তারা নামিয়ে এনেছিলেন জীবন্ত ফ্লাইং সসারকে। সত্যজিৎ এর ‘বঙ্কু বাবুর ডায়রি’ গল্পের প্রভাব এখানে চোখে পড়ার মত, কিন্তু গান আর সুরে মহীনের ধারায় নিজস্বতা অস্বীকার করার উপায় নেই। রঞ্জনের লিরিকে এক ধরণের বিদ্বেষ কাজ করেছে সে সময়ের কর্পোরেট ব্যাঙ্ক অফিসার আর কর্পোরেশনের প্রতি, আর গিটার-ভায়োলিনে অনবদ্য কাজ দেখিয়েছেন গৌতম-এব্রাহাম-প্রদীপ। অ্যালবামের অন্য গান ‘শোনো শুধীজন’ ঘোড়াদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিধ্বনি। স্যাক্সো আর ইলেক্ট্রিক সিম্ফোনিক রিদমের কোরাসে সমাজ অধিপতীদের সাবধানী সংকেত শুনিয়ে যায় এ গান।

‘হাংরি জেনারেশন’ এর মতই মহীনের প্রতিকূলে দাঁড়িয়েছিল অসংখ্য বাধা, যার প্রমাণ মিলত তাদের কাছে আসা অসংখ্য অভিযোগপত্রে। শিল্পীমহল থেকে শুরু করে শ্রোতারা যাচ্ছেতাই গালমন্দ লিখে পাঠাচ্ছিলেন। রঞ্জনের ভাষায় এ ‘আঁতেল’ শ্রেণীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও ছিল তাদের, রঞ্জন একে একে সব অভিযোগ জমিয়ে বানিয়েছিলেন তাদের দ্বিতীয় রেকর্ডের কাভার। শিশুতোষ মনে হলেও রঞ্জন এ ব্যাপারে ছিলেন ভীষণ সিরিয়াস। এদিকে রবীন্দ্র সদন ছাড়াও কলকাতা আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবের মতো পনেরো-বিশটি অনুষ্ঠান করেছিলেন তারা। যোগেশ মাইম অ্যাকাডেমি, স্টার ভবন, ম্যাক্স মুলার ভবনের সে অনুষ্ঠান অবশ্য ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আর তাদের টিকিটগুলোও ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, ব্যান্ড সদস্যদের বুড়াঙ্গুলের ছাপ দিয়ে বানানো সে পাসগুলো দেখাতো ডাকটিকিটের মত।

৭৯’ সালে যখন ভারতী রেকর্ডস থেকে ‘দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি’ প্রকাশিত হল, ব্যান্ডের কোন অশ্বই চিন্তা করেননি এটি হতে চলেছে তাদের শেষ অ্যালবাম। রেকর্ডের দু’টি গান অর্থে এবং সুরে দুই বিপরীত মেরুর। ‘এই সুরে বহুদূরে’ গানটিকে বলা যেতে মহীনের সব থেকে ‘হ্যাপিয়েস্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট’, যেখানে আছে সুরে সুরে নতুন আশার বাণী। আবার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে ‘চৈত্রের কাফন’, গৌতমের নকশাল জীবনের বিভীষিকার দুঃস্বপ্নের ক্যানভাস আঁকা গানের কথায়। নিজের চোখের সামনে ফেইক এনকাউন্টারে যে বন্ধু মারা গিয়েছিলেন, তার স্মৃতি বেধনাবিধুর এক আবহ তৈরি করে গানের সাইকেডেলিয়া আচ্ছন্ন ফ্ল্যামেঙ্কো।

এই ‘চৈত্রের কাফন’এ এসেই যেন শেষ পেরেকটা লেগেছিল অশ্বদের আস্তাবলে। হাসি-ঠাট্টার মগ্ন সাত তরুণের ভালোবাসা আর বিদ্রোহের মন্ত্রে যে গান ও সুর সৃষ্টি হয়েছিল, তাদের চোখের সামনেই সেগুলো নষ্ট হয়েছিল রেকর্ড প্রোডিউসার আর শ্রোতামহলের হাতে। ৮১’ তে অ্যালবামের বিক্রি নেই। ঘুড়ি ওড়ানো কুয়াশা-তুলির কলকাতার আকাশ তখন ঘোড়াদের জন্য থমথমে মেঘময়। নিওলিথ মহেঞ্জোদারোর প্রান্তর পেরিয়ে আসা ক্লান্ত ঘোড়ারা চৈত্রের হলুদ বিকালে বিদায় নেয় একে অপরের কাছ থেকে, রানওয়ের বিষণ্ন শূণ্যতাই তখন শুধু পড়ে থাকে।

বিদায় নিলেও ঘোড়ারা একদিন ফিরেছিল বন বাদাড় ঘুরে এসে, আবার ঠিক বছর কুড়ি পরে…